বসনিয়া-হ্যারৎসেগোভিনায় শরণার্থীদের শীত
শীতের প্রকোপে মানবেতর দিন পার করছেন বসনিয়া-হ্যারৎসেগোভিনার ভুচিয়াক ক্যাম্পের শরণার্থীরা৷ অস্থায়ী এই ক্যাম্পের পরিবেশ এমনিতেই নোংরা আর অস্বাস্থ্যকর৷ সেই সঙ্গে শীতের কারণে আরও বিপাকে পড়েছেন সেখানে আশ্রয়গ্রহণকারীরা৷
কেন বসনিয়া-হ্যারৎসেগোভিনায়?
ইউরোপে প্রবেশের জন্য নতুন নতুন পথ খুঁজে নিচ্ছে অভিবাসীরা৷ তারই একটি বসনিয়া-ক্রোয়েশিয়া সীমান্ত৷ সেখান দিয়ে তারা পাড়ি জমাতে চান মধ্য আর পশ্চিম ইউরোপে৷
ঠাঁই ময়লার ভাগাড়ে
বর্তমানে বসনিয়া-হ্যারৎসেগোভিনায় ৭,০০০-৮,০০০ অভিবাসী শরণার্থী রয়েছে৷ তবে তাদের অধিকাংশই আটকা পড়েছে উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের ছোট্ট শহর বিহাকে৷ সেখানকার ক্যাম্পগুলো এরইমধ্যে ধারণক্ষমতা অতিক্রম করেছে৷ আর সেজন্যেই পরিত্যক্ত ময়লার ভাগাড়ে গড়ে তোলা হয়েছে নতুন এক ক্যাম্প৷
শীতের সঙ্গে বসবাস
অস্থায়ী এই ক্যাম্প অঞ্চলে অক্টোবর থেকেই প্রচণ্ড ঠান্ডা নামতে শুরু করেছে৷ এরই মধ্যে তাপমাত্রা নেমে এসেছে ১০ ডিগ্রির নিচে৷ ঠান্ডা থেকে বাঁচার জন্য অভিবাসীদের কাছে নেই পর্যাপ্ত কাপড়৷ এমনকি অনেকের পায়ের জুতাটিও নেই৷ দানের পোশাক আর কম্বলই তাদের একমাত্র ভরসা৷
ধোঁয়া অথবা মৃত্যু
পাতলা তেরপলের পর্দা ভেদ করে ঠিকই ঠান্ডা ঢুকে পড়ে তাবুর ভেতরে৷ সেজন্য আগুন জ্বালিয়ে কিছুটা উষ্ণতা নেয়ার চেষ্টা করছেন কয়েকজন শরণার্থী৷ তাদের মধ্যে আছেন সিরিয়ান, আফগান ও পাকিস্তানি৷ আগুনের ধোঁয়ায় শ্বাস নিতে কষ্ট হলেও তা শীতে মৃত্যুর চেয়ে নিশ্চয়ই ভাল৷
মৃত্যু অনিবার্য
ক্যাম্পটি বন্ধ করে শরণার্থীদের জন্য আরো উন্নত ব্যবস্থার উদ্যোগ নিতে বসনিয়া সরকারের প্রতি আর্জি জানিয়ে আসছে দাতা সংস্থাগুলো৷ জাতিসংঘের অভিবাসন বিষয়ক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল অর্গানাইজেশন ফর মাইগ্রেশন তার একটি৷ তাদের পশ্চিম বলকান সমন্বয়ক পিটার ফন দেয়ার আউয়েরায়ের্ট বলেন, ‘‘শীতের সময়টা সেখানে কাটালে মানুষগুলোর কয়েকদিন বা সপ্তাহর মধ্যেই মৃত্যু ঘটবে৷’’
ইউরোপ কত দূর
ভুচিয়াক থেকে ক্রোয়েশিয়ার দুরত্ব মাত্র আট কিলোমিটার৷ দুই দেশের মধ্যে অরক্ষিত সীমান্তপথে অবৈধভাবে ইউরোপে পাড়ি জমাতে চান শরণার্থীরা৷ কেউ সফল হন, কেউ ব্যর্থ হয়ে ফিরে আসেন ক্যাম্পে৷ যেমনটা ঘটেছে সিরিয়ার এই তিন ব্যক্তির ক্ষেত্রে৷ সীমান্ত পাড়ির এই পথে আছে ল্যান্ডমাইনের ভয়ও৷ যেগুলো ১৯৯০ সালে যুগোস্লাভিয়া যুদ্ধের সময় পুঁতে রাখা হয়েছিল৷
ঠান্ডা জলে গোসল
বোতল ভর্তি ঠান্ডা পানিই গোসলের একমাত্র উপায়৷ ক্যাম্পের পরিবেশ অস্বাস্থ্যকর হওয়ায় আশ্রয় নেয়াদের বিভিন্ন রোগ লেগেই থাকে৷ খোস-পাঁচড়ার মত সমস্যা ক্রমশ ছড়াচ্ছে৷ নেই তেমন কোন স্বাস্থ্য সেবার ব্যবস্থা৷ গুরুতর কোন অসুখে পড়লেই কেবল হাসপাতালে যাওয়ার সুযোগ পান তারা৷
বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন
ক্যাম্পে পানি আর বিদ্যুৎ দুইয়েরই অভাব আছে৷ যাদের কাছে মোবাইল আছে তারা কিছুটা ভাগ্যবান, পরিবার, বন্ধুবান্ধব আর পাড়ি জমানোর জন্য যোগাযোগের সুযোগ পান তারা৷ কিন্তু অনেক শরণার্থী জানিয়েছেন, সীমান্তে ক্রোয়েশিয়ার পুলিশ তাদের মোবাইল নষ্ট করে ফেলেছে৷ যদিও এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে ক্রোয়েশিয়া৷
ভাল থাকার চেষ্টা
শত কষ্টের মধ্যেও আনন্দে থাকার উপলক্ষ খোঁজেন এসব অভিবাসী৷ রেডক্রস যা সরবরাহ করে তা দিয়ে বড়জোর দিনে দুইবেলা উদরপূর্তি হয়৷ সংস্থাটির অভিযোগ সেখানকার কেন্দ্রীয় সরকার অভিবাসীদের পর্যাপ্ত সহযোগিতা দেয়ার ক্ষেত্রে বাধা তৈরি করছে৷
মুক্তির স্বপ্ন
তাবুর বাইরে আগুন জ্বালিয়েছেন শরণার্থীরা৷ সবাই মিলে কিছুটা উষ্ণতা নেয়ার চেষ্টা করছেন৷ এই মানুষগুলো ভুচিয়াক ক্যাম্পের কষ্টকর জীবন পেছনে ফেলে এগিয়ে যেতে চান তাদের স্বপ্নযাত্রায়৷ কেননা, ‘‘আমি স্লোভেনিয়া ও ক্রোয়েশিয়ায় প্রাণীদের ব্যবস্থা দেখেছি, যা এই ক্যাম্পের চেয়ে উন্নততর,’’ বলেন এক আফগান ৷ তাঁর মতে, ‘‘এটি কোনো ক্যাম্প নয়৷ এখানে মানুষের জন্য কোন জায়গা নেই৷’’