গ্রিস দেউলিয়া হলে ইউরো এলাকার জন্য তার পরিণাম হবে ভয়াবহ
১৬ সেপ্টেম্বর ২০১১দেনা শোধ করতে পারে না, এমন মানুষের সংখ্যা কম নয়৷ অনেক সংস্থাও দেনা শোধ করতে না পেরে দেউলিয়া হয়ে যায়৷ কিন্তু একটা গোটা রাষ্ট্র যদি দেউলিয়া হয়ে যায়? তার উপর আবার সেই রাষ্ট্রের মুদ্রা যদি আরও ১৬টি দেশে চালু থাকে?
গ্রিসকে ঘিরে বর্তমানে যে সংকট চলছে, তার ফলে এমনই এক আশঙ্কা বাস্তব ঘটনা হয়ে উঠতে পারে৷ ইউরোপীয় রাজনীতির মূল স্রোতে গ্রিসকে দেউলিয়া হতে না দেওয়া ও যেমন করে হোক ইউরো এলাকার মধ্যে রেখে দেওয়ার চেষ্টা চলছে বটে৷ কিন্তু শেষ পর্যন্ত যদি সেই দেশটি সত্যি দেউলিয়া হয়ে ওঠে তার পরিণাম কী হবে, সেবিষয়ে মানুষের স্পষ্ট ধারণা নেই৷
দেনার ভারে জেরবার রাষ্ট্রের ঋণের বোঝা লাঘব করার ঘটনা এর আগেও ঘটেছে – যেমনটা কয়েক বছর আগে আর্জেন্টিনার ক্ষেত্রে ঘটেছিল৷ গ্রিস ইতিমধ্যেই প্রায় ১১,০০০ কোটি ইউরো সাহায্য পেয়েছে, প্রায় একই অঙ্কের দ্বিতীয় একটি প্যাকেজ'এরও প্রস্তুতি চলছে৷ তার পরেও মাথা তুলে দাঁড়াতে পারছে না সেই দেশ৷ দেশে-বিদেশে প্রবল চাপের মুখে সেদেশের সরকার ব্যয় কমাতে অসংখ্য পদক্ষেপ গ্রহণ ও সেগুলি কার্যকর করছে বটে, কিন্তু অর্থনীতির বেহাল অবস্থার কারণে প্রত্যাশা অনুযায়ী রাজস্ব আদায় করা যাচ্ছে না৷
জার্মানির সরকারি জোটের দুই শরিক – উদারপন্থী এফডিপি ও বাভেরিয়ার রক্ষণশীল সিএসইউ দল গ্রিসের দেউলিয়া হওয়ার সম্ভাবনা সম্পর্কে খোলামেলা আলোচনা চাইছে৷ কিন্তু তাদের এই ইঙ্গিতের ফলেই গোটা ইউরোপ জুড়ে আর্থিক বাজারে যে অস্থিরতার সৃষ্টি হয়েছে, তার ফলে শঙ্কিত ইউরো এলাকার দেশগুলি৷ সমালোচকরা জার্মান সরকারের শরিকদের বিরুদ্ধে চরম দায়িত্বজ্ঞানহীনতার অভিযোগ এনেছে৷ ইউরোপের অন্যতম চালিকা শক্তি ও ইউরো এলাকার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দেশের সরকারের মধ্যেই এমন ঐক্যের অভাব যে বিভ্রান্তির সৃষ্টি করছে, তা চ্যান্সেলার আঙ্গেলা ম্যার্কেল'এর নেতৃত্বের ক্ষমতাকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে৷
রাজনৈতিক মঞ্চে এই তর্ক-বিতর্কের মাঝেই বিশেষজ্ঞরা গ্রিসের দেউলিয়া হয়ে যাওয়ার পরিণাম সম্পর্কে আগাম চালচিত্র তুলে ধরছেন৷ তারা বলছেন, প্রথমত কোনো কোম্পানি দেউলিয়া হয়ে গেলে যেমন হয়, গ্রিসের ক্ষেত্রেও তেমনটাই ঘটবে৷ অর্থাৎ গ্রিসকে ঋণ বাবদ যে টাকা ধার দেওয়া হয়েছিল, তার একটা অংশ আর ফেরত পাওয়া যাবে না৷ ইউরো এলাকার বাকি দেশগুলি এখনো পর্যন্ত যে অর্থ ধার দিয়েছিল, গ্রিস তা আর শোধ করতে পারবে না৷ গ্রিস'এর হয়ে যে আর্থিক গ্যারেন্টি তারা দিয়েছিল, তার ফলেও দাতা দেশগুলির ক্ষতি হতে পারে৷ সেই ঋণের ভার তখন দাতা দেশগুলির নিজেদের বাজেটের উপর গিয়ে পড়বে৷
জার্মানির হানোফার বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থিক বিশেষজ্ঞ স্টেফান হোমবুর্গ এপ্রসঙ্গে বললেন, ‘‘সত্যি যদি এমন এক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, যে গ্রিস জানিয়ে দেয় যে সেদেশ আর দেনা শোধ করতে পারবে না, তখন জার্মানির ঋণের ভার আচমকা কয়েক ধাপ বেড়ে যাবে৷ এমনকি ইউরো এলাকায় বাজেট ঘাটতির যে উর্দ্ধসীমা রয়েছে, জার্মানির ঋণ তার চেয়ে অনেক বেশি হয়ে দাঁড়াবে৷ তখন জার্মানির পক্ষেও বাজার থেকে ঋণ নেওয়া আগের তুলনায় কঠিন হয়ে পড়বে৷''
অর্থাৎ এমন এক পরিস্থিতি দেখা দিলে ঋণ নিলেও জার্মানিকে চড়া সুদের হার গুনতে হবে৷ জার্মানির পক্ষে হয়তো এই বাড়তি বোঝা সামলানো তেমন কঠিন হবে না, কিন্তু ইউরো এলাকার অপেক্ষাকৃত দুর্বল দেশগুলি – যেমন পর্তুগাল, আয়ারল্যান্ড, ইটালি ও স্পেন এমন অবস্থায় সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত হয়ে পড়বে৷ তাছাড়া বাজারের প্রতিক্রিয়াও ভয়ঙ্কর হতে পারে৷ গোটা ইউরো এলাকা সম্পর্কেই আস্থার অভাব দেখা দিলে তার পরিণাম মারাত্মক হতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন৷ অথবা বাজার সমগ্র ইউরো এলাকার বদলে ইউরো এলাকার একের পর এক সদস্য দেশকে লক্ষ্যবস্তু করতে পারে৷
গ্রিস দেউলিয়া হয়ে গেলে শুধু ইউরো এলাকার বাকি রাষ্ট্রগুলি নয়, বিপদে পড়বে অনেক ব্যাংকও৷ গত কয়েক মাসে অনেক ব্যাংক গ্রিসের বন্ড ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংককে বিক্রি করে নিজেদের হাত ঝেড়ে ফেলেছে বটে, কিন্তু তা সত্ত্বেও বিপদ পুরোপুরি কাটে নি৷ কারণ বাজারে অনেক লগ্নিকারীর ধারণা, গ্রিস দেউলিয়া হয়ে গেলে অনেক ব্যাংক সেই ধাক্কা সামলে উঠতে পারবে না৷ বর্তমান অনিশ্চয়তার ফলে চলতি সপ্তাহে জার্মানি ও ফ্রান্সের বেশ কিছু ব্যাংকের শেয়ারের মূল্য হু হু করে পড়ে গেছে৷
সব মিলিয়ে এমন ভয়াবহ পরিস্থিতি সম্পর্কে সাবধান করে দিয়েছেন জার্মানির বিরোধী সামাজিক গণতন্ত্রী এসপিডি দলের নেতা সিগমার গাব্রিয়েল৷ তিনি বলেন, ‘‘গ্রিস ইউরো এলাকা ত্যাগ করলেই বিপদ কেটে যাচ্ছে না৷ তখন আর্থিক বাজার একে একে পর্তুগাল, স্পেন, ইটালির মতো দেশগুলির ক্ষমতাও পরীক্ষা করে দেখতে থাকবে৷ তারপর একটা সময় আসবে, যখন দেখা যাবে ইউরো এলাকা সঙ্কুচিত হতে হতে ফ্রান্স ও জার্মানির সীমান্তে এসে দাঁড়িয়েছে৷''
অনেকে মনে করছেন, দেউলিয়া হওয়ার বিপদের কথা বলে আসলে গ্রিসের সরকারের উপরই বাড়তি চাপ সৃষ্টি করার চেষ্টা চলছে৷ ব্যয় কমিয়ে ও আয় বাড়িয়ে তাদেরই পরিস্থিতি সামাল দিতে হবে, এথেন্স সরকারের কাছে এমন বার্তাই পাঠানো হচ্ছে৷ এমনটা না করলে তারা বকেয়া সাহায্য হাতে পাবে না৷ কিন্তু পৌরাণিক যুগে হারকিউলিস যে অসাধ্য সাধন করেছিলেন, বর্তমান যুগে সংকট কাটানোর সেরকম ক্ষমতা গ্রিসের নেই বলেই মনে হচ্ছে৷
প্রতিবেদন: সঞ্জীব বর্মন
সম্পাদনা: আব্দুল্লাহ আল-ফারূক